The first 183 lines.
সবচেয়ে অমূল্য বোঝা!
এক ছিলো এক জঙ্গল, সেখানে থাকত
এক দরিদ্র কাঠুরে আর তার গরিব স্ত্রী।
না, না, নিশ্চিন্ত থাকুন, এটা কোনো "বামনপুত্রে"র গল্প নয়।
ওর সঙ্গে একদমই মিল নেই!
আর আমার মতো আপনারাও ঐ গল্পটা একদম পছন্দ করেন না।
বলুন তো, কখন আর কোথায় বাবা-মায়েরা কেবল খাবারের অভাবে নিজের সন্তানকে ফেলে দেয়?
ধুর, ফালতু কথা...
দরিদ্র কাঠুরে আর তার স্ত্রী কখনো জঙ্গল ছেড়ে বেরোয়নি।
তবু ঠান্ডা, ক্ষুধা আর দারিদ্র্য তাদের জীবনটা খুবই কঠিন করে তুলেছিলো।
বিশেষ করে তখনকার যুদ্ধের দিনে।
হ্যাঁ হ্যাঁ, সেই... বিশ্বযুদ্ধের দিনে।
তবে সব খারাপেরই একটুখানি ভালো দিক থাকে।
দরিদ্র কাঠুরে আর তার স্ত্রীকে
কয়েক বছর ধরে কোনো সন্তানকে খাওয়াতে হয়নি।
মমতা দেওয়ার মতো কেউ না থাকায়,
কাঠুরের স্ত্রী প্রতিদিন আক্ষেপ করত।
কিন্তু কাঠুরে নিজে মোটেই অসুবিধায় পড়েনি।
সন্তান নেই ঠিকই, তবে খাওয়ানোর মুখও নেই আর—সেটাও কম স্বস্তির নয়।
ধীরে ধীরে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে
গরিব কাঠুরের স্ত্রী বুঝতে শুরু করল, পৃথিবীর শক্তি, স্বর্গের ইচ্ছা
আর পরিদের জাদু— সবই যেন তার কাঠুরে স্বামীর সঙ্গে
একজোট হয়েছে, তাকে সন্তানসুখ থেকে বঞ্চিত করতে।
আর সে তার ভাগ্য মেনে নিল, ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে গেল
ঠান্ডা, ক্ষুধা, দুঃখ-কষ্ট আর একাকিত্বের সঙ্গে।
কিন্তু একদিন...
ট্রেনের দেবতা, আমি চিরকাল তোমাকে ধন্যবাদ জানাই…
আমার জীবনে আসার জন্য এবং আমাকে ছেড়ে না যাওয়ার জন্য।
তোমার প্রতি আশীর্বাদ জানাই—তুমি শহর থেকে এসে আমার কাছে কোলাহল আর জীবনের ছোঁয়া এনেছো।
তোমার দয়ায় আমি কৃতজ্ঞ।
তুমি আমার জীবন বদলে দিয়েছ।
আমাকে ক্ষুধা আর দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করো।
একটু কিছু দাও, একটু খাবার,
কিংবা একটু কিছু বলার মতো।
তোমার কাছে যা বাড়তি মাল আছে,
খুব বেশি নয়, একটুখানি দিলেই চলবে।
আমি তোমার করুণার ভিখারি, ট্রেনের দেবতা,
তুমিই আমার আলো, তুমিই আশার শেষ ঠিকানা।
আমার কথা শোনো, প্রভু।
অনুবাদ ও সম্পাদনা ~ জাহিদ হাসান ~
এটা কী?
এটা কী?
–ট্রেনের দেবতারা দিয়েছে আমাকে। –ট্রেনের দেবতা?
হ্যাঁ, যাতে ও আমাদের হারানো সন্তানের মতো হয়ে উঠতে পারে ।
আর তুমি কি জানো না এই শিশু আসলে কী?
ট্রেন থেকে এসেছে মানে তুমি বুঝছো না এটা কোন জাতের?
ওরা হলো নিষ্ঠুরদের দল!
না, না, এ তো একটুখানি সামানা মাত্র।
ট্রেনের দেবতারা আমায় দিয়েছেন।
ধিক সে সামানাকে!
ধিক্কার!
ধিক্কার!
অভিশপ্ত জাতের সন্তান।
–থামো, থামো! –না, না, ও একটা ফেরেশতা।
ও আমার ফেরেশতা।
ফেরেশতা, ফেরেশতা! কান দিয়ে শোনো ওর কান্না।
তুমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছো, বুড়ি। বড় হলে ও ঠিক ওদের মতো হবে।
না, যদি আমরা ওকে বড় করি।
ওরা ঈশ্বরকে মেরেছে।
ওরা চোর। ওর জামাকাপড়ের দিকে তাকাও।
এই রকম কাপড় কিনতে কত দিন কাজ করতে হয় জানো?
আমি বলছি, ওরা চোর।
তাহলে ভালোই হলো, আমাদের কাছে চুরি করার মতো কিছু নেই!
আর শিগগিরই, যদি তুমি রাজি থাকো, ও আমাকে কাঠের আঁটি বাঁধতে সাহায্য করবে।
ওকে আমাদের কাছে পেলে ওরা আমাদের মেরে ফেলবে।
কিন্তু... কিন্তু কে জানবে?
অন্য কাঠুরেরা।
অন্য কাঠুরেরা আমাদের ধরিয়ে দেবে।
না, আমি বলবো এই সন্তান আমাদেরই,
শেষমেশ তোমার হাত ধরে আমি আবার গর্ভবতী হয়েছি।
ও আমাদের হতে পারে না। ওর দাগ আছে।
–কী বলছো? –দাগ আছে, দাগ।
ওরা আমাদের মতো নয়।
দেখো, দেখো দাগটা।
কিন্তু কীসের দাগ?
আমি তো কিছুই দেখছি না।
ও আমার মতো নয়, দেখছ না?
না।
কিন্তু ও আমার মতো।
দেখো কী সুন্দর।
তুমি কী করছো?
কোথায় যাচ্ছো?
ওকে আবার রেললাইনের ধারে রেখে আসতে যাচ্ছি।
যদি দেবতারা ওকে রেখে থাকে, তাহলে ওরা ফেরত নিক।
যদি তুমি তা করো, কাঠুরে, তাহলে আমাকেও ওর সাথে
মালগাড়ির তলায় ফেলে দিতে হবে।
আর দেবতারা, সব দেবতা—স্বর্গের,
প্রকৃতির, সূর্যের আর ট্রেনের দেবতারা—
তোমায় খুঁজে বের করবে, যেখানেই থাকো না কেন, যাই করো না কেন।
চিরকালের জন্য তুমি অভিশপ্ত হবে!
তবে তা-ই হোক। এরপর যা অভিশাপ আসবে, সব তোমার কপালে।
ও আমাকে সুখ এনে দেবে, আর তোমাকেও।
সুখ তোমারই থাক, আমার কিছু যায় আসে না।
কিন্তু শোনো, আমি কখনো ওর কোনো আওয়াজ শুনতে চাই না, ওকে দেখতেও চাই না!
ওকে চুপ করাও...
...আর মনে রেখো, তোমাকে সতর্ক করা হলো।
বেচারি, দুধ দরকার ওর,
ওর কোনো সম্ভাবনাই নেই।
যদি ট্রেনের দেবতা আমাকে এই ছোট্ট বোঝাটা দিয়ে থাকেন,
তাহলে সেটা মরার জন্য নয়।
ও বাঁচবে, শুনতে পাচ্ছো?
ও বাঁচবেই।
কে ওখানে?
এক গরিব কাঠুরির বউ।
কি চাও, গরিব কাঠুরির বউ?
দুধ, আমার বাচ্চার জন্য।
তাই নাকি? তাহলে নিজের দুধ দিচ্ছো না কেন?
আফসোস, আমার নেই।
আর এই বাচ্চাটা যদি আজ দুধ না পায়, ও মরে যাবে।
মরে যাবে? তাতে কী?
আরেকটা হবে।
আমার বয়েস হয়ে গেছে।
আর এই বাচ্চাটাকে আমার হাতে তুলে দিয়েছেন...
রেলের ওপর দিয়ে যাওয়া মালগাড়ির দেবতা।
মালগাড়ির দেবতা তোমার হাতে এমন বোঝা তুলে দিয়েছেন?
তাহলে দুধটাও সঙ্গে দিলেন না কেন?
তিনি ভুলে গেছেন।
দেবতারা সব মনে রাখতে পারেন না।
তাদের এখানে অনেক কাজ করতে হয়।
আর তারা সেসব খুব বাজেভাবে করে।
বল তো, কাঠুরির বউ, আমি এই দুধ পাই কোথায়?
তোমার ছাগলের দুধ থেকে।
আমার ছাগল?
তোমার কেন মনে হলো, আমার ছাগল আছে?
তোমার জমির ধারে কাঠ কাটতে গিয়ে ছাগলের ডাক শুনেছি।
আর আমার দুধের বদলে তুমি কি দেবে?
-আমার যা আছে সব। -তোমার কী আছে?
-কিছুই নেই। -এটা তো খুবই কম।
প্রতিদিন দেবতারা যে কাঠ দেন,
তার থেকে এক আঁটি আনবো, দুই চুমুক দুধের বদলে।
আমারই কাঠ দিয়ে আমার দুধ কিনতে চাও?
ঐ কাঠ তোমার নয়।
আমার কাছেও তোমার কিছু নেই।
যেমন তোমার দুধ আসলে তোমার নয়, সেটা ছাগলের দুধ।
কিন্তু ছাগলটা আমার।
বিনিময় ছাড়া জীবনে কিছুই পাওয়া যায় না।
দুধ না পেলে আমার মেয়ে মরে যাবে!
বিনা বদলেই।
আমাকে সাহায্য করুন!
আপনি যদি ওকে খাওয়াতে সাহায্য করেন, তাহলে বেঁচে যাবে।
দেবতারা আপনাকে ধন্য করবে।
আপনাকে রক্ষা করবে!
তারা আমাকে আগে থেকেই যথেষ্ট রক্ষা করেছে, ম্যাডাম
দেখো!
দেখো, তোমার দেবতারা কীভাবে আমাকে রক্ষা করেছে।
আমি কি তোমায় ভয় দেখাচ্ছি?
না!
তাহলে মায়া লাগছে?
না, তাও নয়।
দেবতারা আপনাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
আর আপনার ছাগলকেও।
হ্যাঁ, বাঁচিয়েছে।
এই নিন। এই শালটা নিন।
দেখুন কত সুন্দর।
দেবতারা নিজের হাতে বুনেছে, সোনার সুতো দিয়ে।
বেচাকেনার কৌশল ভালোই জানো দেখছি!
তোমার সেই ছোট্ট বোঝাটা দেখি।
তোমার দেবশিশুটি দেখছি একদম মানুষের বাচ্চার মতোই ক্ষুধার্ত।
আমার ছাগলের এক চুমুক দুধ দেব তোমায়।
ধন্যবাদ। ধন্যবাদ।
ওঠো।
ওঠো বলছি।
আপনি অনেক দয়ালু!
না, না। আমরা লেনদেন করেছি।
চলো।
তোমার প্রাপ্যটা দিয়ে দিই।
কে আপনার মাথা ফাটালো, স্যার?
-যুদ্ধ। -এই যুদ্ধ?
না।
আরেকটা, অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে।
আর কখনো আমার সামনে হাঁটু গেড়ে বসবে না, কারো সামনেই না!
আর কখনো বলবে না আমি দয়ালু,
আমার একটা ছাগল আছে, আর আমি তোমায় দুধ দেই,
এই কথাটা ছড়ানোর সাহস কোরো না,
না হলে মেরে ফেলব।
নড়বি না!
ওই বাচ্চাকে চুপ করাও!
ঘুমাতে পারছি না!
শান্ত হও, কাঠুরে। তুমিই তো ওকে ভয় দেখাচ্ছো।
আমি, ভয় দেখাচ্ছি? তুমি ভুল করেছো, বোকা মহিলা।
ও শয়তানের বাচ্চা, কাউকেই ভয় পায় না।
ওর বুকের মধ্যে হৃদয় বলে কিছু নেই।
বুঝতে পেরেছো? কোনো হৃদয় নেই!
No comments yet. Be the first to leave one.