The first 184 lines.
বাংলা সাব সজীব
এটা আমাদের পৃথিবীর সর্বশেষ প্রান্ত,
একটি গভীর পৃথিবী যেখানে কেবল অকুতোভয় ব্যাক্তিই যাওয়ার সাহস রাখে।
আমাদের পায়ের নীচে,
গুহামুখ এবং গুহাপথ গুলোর দৈর্ঘ্য এখনো আমাদের অজানা
মেক্সিকোর একটি গুহামুখ,
এর তলদেশ ৪০০ মিটার গভীরে,
এতোটাই গভীর যে এর ভেতরে অনায়াসে এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং কে ঢুকিয়ে ফেলা যাবে,
এটা পৃথিবীর বৃহত্তম গুহামুখ,
তারপরও, এটি আবিস্কার করা হয়েছে,
মানুষ চাঁদে পা রাখার মাত্র দুবছর আগে,
আজ পর্যন্ত, এই গুহাগুলিই মানুষের জন্য সবচে দুর্গম স্থান
তারপরেও, মানুষই একমাত্র প্রাণী নয়,
যারা এই অন্ধকার এবং স্যাতসেতে স্থানে প্রথম পা রেখেছে,
এখানে, কিছু অদ্ভুত এবং অজানা প্রাণী বসবাস করে।
এই ছোট ছোট আলোর ছায়াপথটি গড়ে উঠেছে, হাজার হাজার ছোট পোকা দ্বারা,
যে কোন প্রাণীই এই গুহার গভীরে বাস করুক, তাকে নিকষ কালো অন্ধকারকে মানিয়ে নিতে হয়।
কিন্তু নিউজিল্যান্ডের এই গুহায়, কেউ কেউ এই অন্ধকারকেই নিজেদের কাজে লাগিয়েছে।
ছাদের থেকে একটি সিলিকনের সুতা ঝুলছে,
এরকম শয়ে শয়ে সুতো,
যদিও, এই সুতোগুলো দেখতে দারুন,
এগুলোর কিছু শয়তানী উদ্দেশ্য আছে,
এটা হচ্ছে গুহার উজ্জ্বল পোকা।
তার শিকারকে ফাদে ফেলার জন্য, এটি রেশমের সুতা নিয়ে শিকারে বেড়িয়েছে,
এই সুতাটা বের হয় এই পোকাগুলোর মুখের লালা থেকে
এবং এর সাথে যোগ হয় কিছু আঠালো লালা।
প্রতিটি পোকা এরকম ডজনখানেক সুতো তৈরি করে।
একবার এই সুতাটি তৈরি হয়ে গেলে,
এই পোকাটি একটি ঝুলানো বিছানা তৈরি করে
এবং অপেক্ষা করে, একজন ধৈর্যশীল মাছ ধরার লোকের মতো
কিন্তু এই পোকাগুলো ভাগ্যের উপর নিজেকে সঁপে দেয় না
এই ভৌতিক নীলচে আলোগুলো, এক ধরনের রাসায়নিক ক্রিয়ার ফল
যে ক্রিয়া ঘটছে পোকাটির লেজের একটি ছোট থলির ভেতর।
আক্ষরিক অর্থেই এটি তার পেছন দিকের আলো।
এটা শিকারকে আকৃষ্ট করার একটি টোপ।
পোকারা এই আলোর দিকে এক অদম্য কৌতূহল নিয়ে এগিয়ে যায়,
এবং এই আঠালো সুতায় আটকে যায়,
একবার আটকে গেলে,
আর পালানো সম্ভব হয় না।
এখন শুধু সুতো টেনে উপরে তোলার পালা,
এবং ধীরে ধীরে তার শিকারকে খাওয়া শুরু করে- জীবিত অবস্থাতেই।
এই গুহাতে জন্ম নেয়া এই পোকাগুলোকে ধরার মাধ্যমে,
এই পোকাগুলো প্রথম সমস্যাটার সমাধান করে নিয়েছে
যা এই গুহাবাসীদের প্রধান সমস্যা
আর তা হচ্ছে নিয়মিত খাবার জোগাড় করা
কেবলমাত্র এক ধরনের পাথরেই এই ধরনের মাটির নিচের জগত তৈরি করতে পারে।
চুনাপাথর।
পৃথিবীর বেশিরভাগ গুহাই এই ধরনের পাথরে পাওয়া যায়,
এবং এই ধরনের পাথরেই পৃথিবীর শতকরা ১০ ভাগ পরিপুর্ন
এই চুনাপাথর তৈরি হয়েছে, সামুদ্রিক ঝিনুক এবং প্রবাল থেকে পাওয়া খনিজ দিয়ে।
যদিও আমেরিকার এই খাড়া পাহাড়গুলো
এখন সাগরপৃষ্ঠ থেকে প্রায় শত শত মিটার উপরে
আসলে এগুলো সাগর তলে সৃষ্টি হয়েছে।
ভিয়েতনামের এই হা লং বে এর চুনাপাথরের স্তম্ভ গুলো
এখনো মনে করিয়ে দেয় এদের সমুদ্রের সাথে যোগাযোগ
প্রকৃতপক্ষে এই পুরো অঞ্চলটা একটি চুনাপাথরের আস্ত চাই এর মতো ছিল
যেটি ছিল একট বিশাল প্রবাল প্রাচিরের ভিত্তি।
বোর্নিওতে, বৃষ্টি এই চুনাপাথরগুলোকে ক্ষয় করে চোখা এবং প্রচন্ড ধারালো পাথরে পরিণত করছে।
কিন্তু বৃষ্টির পানির এই ক্ষয়কারী শক্তি,
মাটির নীচে এক নাটকীয় ঘটনা মঞ্চস্থ করেছে,
চুনাপাথরের উপর দিয়ে নদীর ধারা চলতে চলতে হঠাত হারিয়ে যায়,
যখন পানি নিচের দিকের কোন শক্ত পাথরে গিয়ে ঠেকে,
তখন এর পথ বেঁকে যায়,
মাটির নীচে,
এই পানি এক নতুন ক্ষয়কারী শক্তি হিসেবে ফিরে আসে,
মাটির উপর দিয়ে যাত্রার সময়,
এটি মাটি থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড গ্রহন করে
একটু অম্লীয় দ্রবনে পরিণত হয়।
এবং লক্ষ লক্ষ বছর ধরে এই অম্লীয় দ্রবন চুনাপাথর গুলোকে ক্ষয় করে আসছে,
এবং এই গুহা এবং গিরিপথের ধাঁধাঁ তৈরি করেছে।
যা মাঝে মাঝে মাইলের পর মাইল চলে যায়।
এটি হচ্ছে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ভুগর্ভস্থ নদীর চলার পথ,
এটা এতোটাই বড়, একটি জাম্বো জেট এর ভেতর দিয়ে উড়ে যেতে পারবে।
এটা বোর্নিওর হরিণ গুহা।
এই হরিণ গুহাটি বিশাল হবার কারনে,
কিছু প্রাণী এখানে অনেক সংখ্যায় জড়ো হয়।
ত্রিশ লক্ষ কুঁচকানো ঠোটের বাদুরের বাস এখানে।
এই বাদুরগুলো গুহার উঁচু ছাদে ঝুলে থাকে।
এখানে তারা বাইরের উপদ্রব থেকে দূরে থাকে
এবং শিকারি প্রাণী থেকেও নিরাপদে থাকে।
এবং এখানে ঝুলে থাকা অবস্থায়,
তারা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা জিনিস তৈরি করে।
এই কয়েকশত মিটার উঁচু ময়লার স্তূপটি তৈরি হয়েছে বাদুরের উচ্ছিষ্ট দিয়ে -
গুয়ানো
এর উপরিভাগে লক্ষ কোটি তেলাপোকা
কার্পেটের মতো ঢেকে রয়েছে।
গুহাগুলি হচ্ছে পৃথিবীর এরকম সামান্য কয়েকটি আবাসভুমির একটি যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছে না।
তাই এখানে গাছপালা না থাকার কারনে, এই গুহার প্রাণীজীবন এই বাদুরের উচ্ছিষ্টের উপর নির্ভরশীল।
তেলাপোকাগুলো এই উচ্চিস্ট খেয়ে বেঁচে থাকে,
এবং অন্য যা কিছুই এর উপর পরুক।
এই উচ্ছিষ্ট অন্য ধরনের পোকাকেও বাচিয়ে রাখে
যেগুলো দিনের বেলায় গুহার দেয়ালে ঘুমিয়ে থাকে
তেলাপোকাগুলো এই বিশাল আকারের শতপদী বিছার খাবারে পরিণত হয়।
কিছু কিছু ২০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে
আজব শোনালেও, এখানে কাঁকড়াও বাস করে।
এই উচ্ছিষ্টের উপর জীবন ধারন করে
এই প্রাণীগুলো তাদের সারাটা জীবন এই গুহাতেই কাটিয়ে দেয়।
তারা সবাই এই হজম না হওয়া উচ্ছিষ্টের উপর নির্ভর করে থাকে
যেগুলো বাদুরেরা বাইরে থেকে খেয়ে এসেছিল।
প্রতি সন্ধ্যায়, মাত্র দুই ঘন্টার মধ্যে
এই ত্রিশ লক্ষ বাদুর গুহার নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসে
বাইরের জঙ্গল থেকে পোকামাকড় ধরে খাওয়ার জন্য,
কিন্তু এদের সবাই ফিরবে না।
যখন তারা গুহা থেকে বাইরে বের হয়,
এই বাদুরের ঝাক, গোল রিং এর মতো গোল হয়ে উড়তে থাকে
এভাবে চক্রাকারে ঘুরতে থেকে তারা উড়তে থাকা ঈগল পাখিকে ধোকা দিতে চায়,
কিন্তু তাদেরকে এখনো নিজেদের রক্ষা করতে হবে আরো শক্তিশালী শিকারি পাখিদের থেকে।
পেরেগ্রিন বাজ এবং বাদুরে বাজ পাখিরা হচ্ছে পাখি জগতের জেট ফাইটার।
দিনের আলো শেষ হবার সাথে সাথে এদের শিকারও শেষ হয়,
এই বাদুরে বাজ গুলি একটিকে ঠোটে আটকে ধরে
আরো ধরার জন্য আবার হানা দেয়।
কোন বাদুর তাদের দল থেকে আলাদা হয়ে গেলে
সেটা একটা পরিস্কার শিকারে পরিণত হয় এবং নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনে।
তারপরও এর রাতের শিকার এই বাদুরের দলের আকারে তেমন কোন পরিবর্তন আনতে পারে না-
সকাল হতেই, এদের বিশাল এক সংখ্যা আবার গুহার নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাবে।
বোর্নিওর এই গুহাতে বাদুরেরা একাই বাস করে না।
এখনে ডে শিফটের ব্যাবস্থাও আছে,
দিনের আলোতে শিকার করা শেষে তারা ফিরে আসে,
এই বাসিন্দারা জোরে ক্লিক শব্দ করতে থাকে
এবং গুহার এই অন্ধকারে তাদের নিজেদের পথ খুঁজে নেয়,
তারা হচ্ছে গুহার সুইফটলেট পাখি
বাদুরদের মতো তারাও শব্দের মাধ্যমে পথ চলে
চারপাশ দেখার জন্য আমাদের আলোর দরকার
কিন্তু এই নিকষ কালো অন্ধকারেও এই সুইফটলেট পাখিরা নির্ভুল ভাবে তাদের ছোট বাসায় ফিরে আসে,
যেগুলো মাত্র কয়েক সেন্টিমিটার চওড়া।
এটা একটি দারুন দক্ষতা, যা আমরা মানুষেরা এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি।
এই পাখিগুলো অন্য আরেকটি কারনে বেশ আলাদা।
তাদের এই বাটির মতো দেখতে বাসাগুলো তাদের মুখের লালা দিয়ে তৈরি।
প্রায় ত্রিশ দিন লেগে যায় তাদের এই বাসাটা বানাতে,
এই বাসাগুলো খুব মূল্যবান
শুধুমাত্র এই পাখিদের কাছে, তা নয়,
প্রায় ৫০০ বছর ধরে মানুষেরা এই সুইফটলেট পাখির বাসা খুঁজে আসছে।
এটা একটা ঝুকিপুর্ন কাজ।
কোন প্রকার নিরাপত্তা ব্যাবস্থা ছাড়াই
এবং কেবলমাত্র বুনো লতার মই বেয়ে
এই সংগ্রাহকরা গুহার একদম উপরে উঠে যায়,
মাঝে মাঝে মাটি থেকে প্রায় ৬০ ফুট ওপরে।
তাদের কাজকে ঝুকিপুর্ন এবং কঠিন মনে হতে পারে
কিন্তু পুরস্কারও আছে মেলা।
এই সুইফটলেট পাখির একটি বিশুদ্ধ সাদা বাসা
পাখির বাসা'র স্যুপ এর অন্যতম উপাদান।
এবং এদের একেক গ্রামের মুল্য, রুপোর চেয়েও বেশী।
একটা বাসা ভেঙ্গে ফেললেই, এই পাখিরা আবার আরেকটি বাসা বানাবে।
তাইতো যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের সংগ্রহ নিয়ন্ত্রনে থাকছে,
এই আবাসভুমি চলতে থাকবে।
এই বোর্নিওর গুহাগুলো পৃথিবীর বৃহত্তম গুহাগুলির অন্যতম
এবং তারা এখনো বড় হচ্ছে,
প্রতি বছর বৃষ্টির পানি একটু একটু করে এই চুনাপাথর ক্ষয় করে যাচ্ছে।
কিন্তু গুহার ভেতর পানি যে কেবল ক্ষয় করে, তা নয়,
এটা তৈরিও করে।
এই পানিগুলোতে চুনাপাথর মিশে আছে,
এবং এটা যখন গুহার বাতাশের সংস্পর্শে আসে,
কিছু চুনাপাথর জমে যায়।
ক্যালসাইট
এটা আস্তে আস্তে জমতে থাকে
এই ক্যালসাইট জমতে জমতে ছাদ থেকে ঝুলে নকশায় পরিণত হয়, -
স্ট্যালাকটাইট।
প্রতিটি ফোটা খুব সামান্য পরিমান ক্যালসাইট ছেড়ে আসে,
কিন্তু ধীরে ধীরে এই সামান্য ক্যালসাইট এরকম অতুলনীয় নকশায় পরিণত হয়,
ছাদের থেকে পানি নীচে পড়লে
গুহার তলাতেও ক্যালসাইট জমতে থাকে
এবং তৈরি করা স্ট্যালাগমাইট
পানির প্রবাহ এবং বায়ু প্রবাহের তারতম্যের কারনে
বিভিন্ন ডিজাইনের নকশা তৈরি হয়, কিন্তু সবগুলিই একই পদ্ধতিতে তৈরি -
চুনাপাথর খুব ধীরে ধীরে জমে গিয়ে।
এবং যখন স্ট্যালাকটাইট স্ট্যালাগমাইটের সাথে মিলে যায়,
একটি থাম তৈরি হয়।
উত্তর আমেরিকার এই চার্লসবাড গুহায়
এধরনের কাঠামো গড়ে উঠতে হাজার হাজার বছর লেগে যায়,
কিন্তু মাঝে মাঝে এই গুহাগুলোর তৈরি একেবারে থেমে যায়,
মেক্সিকোর এই পানিতে নিমজ্জিত গুহাগুলি হাজার হাজার বছর ধরে একই রকম রয়ে গেছে,
শেষ বরফযুগের পর থেকেই এই গুহাগুলো বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
তারপরও বাইরের পৃথিবীতে এদের ভুমিকা অনেক।
৫০০ বছর আগে, তারা এক বিরাট সভ্যতাকে গড়ে তুলেছিল।
মায়া সভ্যতা।
মেক্সিকোর ইয়াকাটান উপদ্বীপে কোন নদী, খাল বা ঝর্না নেই
তাই মায়ান রা এই পানিতে পুর্ন গুহামুখ বা কেনোটি গুলোর উপর নির্ভর করতো।
এই নিমজ্জিত গুহামুখ গুলোই এই অঞ্চলের মানুষের একমাত্র স্বাদু পানির উৎস।
এই কেনোটিগুলো আসলে একেকটি বিশাল পানির কুয়ো।
সূর্যালোকের মতো প্রানদায়ী শক্তি থেকে অনেক দুরে
এখানে কেউ গাছের আশা করবে না।
কিন্তু গুহার অন্ধকার গহীনে,
উপরের জঙ্গলের প্রকান্ড গাছের শেকড় নিচের চুনাপাথরকে ভেদ করে,
নিমজ্জিত গুহায় পৌঁছে গেছে,
No comments yet. Be the first to leave one.