The first 155 lines.
বাংলা সাব সজীব
পৃথিবীর উভয় মেরুই বরফ দিয়ে ঢাকা
তারাই সবচে বড় এবং সবচে আরাধ্য বিজন প্রান্তর
পৃথিবীর অন্য কোথাও ঋতু পরিবর্তন এতোটা প্রকট হয়না।
এর কারনে প্রতি বছর পালা করে বরফ আসে এবং চলে যায়,
এবং এখানকার সব জীবনই এটা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।
যখন প্রথম ভ্রমণকারী দক্ষিন মেরুর দিকে যাত্রা করে।
বরফের বিশালা আকারের তোরন অজানা দেশে তাদের প্রথম পথচিহ্ন খোদাই করে রাখে,
বরফের খাড়া লম্বা চাই অতিক্রম করার সময়েই তারা সামনে অপেক্ষমাণ অপার্থিব রুপ সম্পর্কে ধারনা পেয়ে যায়,
তারা যতই ভেতরে যাচ্ছিল, ততই বরফের আকার বড় হচ্ছিল।
কিন্তু কোন কিছুই তাদের ঠিকমতো ধারনা দিতে পারেনি, তারা নিজের চোখে যা কিছু দেখতে যাচ্ছে,
Terra incognita - অজানা পৃথিবী।
আমাদের পৃথিবীর একেবারে দক্ষিন অবস্থিত "এন্টার্কটিকা"
এটা আকারে প্রায় যুক্তরাষ্ট্রের সমান বড়।
পৃথিবীর যত বরফ তার নব্বইভাগ এখানে পাওয়া যাবে।
এই জমে যাওয়া পৃথিবী অনেকটাই নিস্প্রান থাকে বসন্তের আগ পর্যন্ত
এডেলি পেঙ্গুইন,
খুব তাড়ায় আছে,
ঘড়ির কাটা বয়ে যাচ্ছে,
গ্রীষ্মের বরফ গলার অপেক্ষা না করেই তারা দ্রুতবেগে দক্ষিন দিকে জমে যাওয়া সাগরের দিকে যাচ্ছে,
তারা এখানে এসেছে ডিম পাড়তে কারন মেরুর গ্রীষ্ম খুব স্বল্পস্থায়ী হয়,
বরফ গলতে শুরু করার আগেই তাদের জায়গা বেছে নিতে হবে।
যতই বরফ সরে যেতে শুরু করে ততই দক্ষিন দিকে প্রানের মেলা বসতে থাকে।
এন্টার্কটিকার পানি এতোটাই সমৃদ্ধ যে অনেক দূর দুরান্ত থেকে প্রানীরা এখানে খাবারের সন্ধানে আসে,
অনেক পেঙ্গুইনেরা পাড়ে এসেছে ডিম পাড়ার জন্য।
কোন পাখিই সরাসরি বরফের উপর ডিম পাড়বে না,
তাই ছোট পাথর একটি দরকারি জিনিস এবং ভালো পাথরের সন্ধানে উপরেও উঠে যায় তারা,
এই পাহাড়ের ঢালগুলো শীঘ্রই হাজার হাজার পেঙ্গুইনের বর্জ্যে গোলাপি রঙ ধারন করবে।
একমাত্র এরকম বরফে আচ্ছাদিত অঞ্চলেই পাথুরে জমি মরুদ্যানের মতো মনে হবে।
কেউ কেউ তো এই পাথরের খোঁজে এর একেবারে ভেতরে চলে আসে।
শুধু মাত্র দুপুর বেলাতেই প্রায় কয়েক মাইল গভীর বরফে ঢাকা এই পাহাড়ের চূড়া গুলো বরফহীন হয়।
কেবল বসন্তেই এইরকম কর্কশ ডাকে এখানকার নিস্তব্ধতা ভাঙ্গে
বরফের পেট্রেল পাখিরা এসেছে এবং জোড়া বাধছে,
এই এন্টার্কটিকার পেট্রেলরাই পৃথিবীর সবচে দক্ষিনের অধিবাসি।
এই পাখিরা উপকূল থেকে প্রায় তিনশো মাইল ভিতরে চলে এসেছে,
এই ডিম পাড়ার স্থানে আসার জন্য।
যখন তাদের ডিম ফুটে বাচ্চা বের হবে তারা তখন বাধ্য হবে ছয়শো মাইলের এই আসা যাওয়ার পথ
পাড়ি দিয়ে সাগর থেকে খাবার নিয়ে আসতে।
প্রথমে অবশ্য তাদের ভুমিদস্যুদের হাত থেকে নিজের বাসাকে রক্ষা করতে হবে।
ডিম পাড়া হয়ে গেলে পেট্রেলরা সময় নিয়ে নিজেদের পরিস্কার করে নেয়,
দক্ষিন মেরুর স্কুয়া পাখিরা বেশ সুযোগসন্ধানী
কিন্তু স্কুয়া পাখিরা পেট্রেলদের ধরার চেস্টাই করেনা,
তারা তো ওর জন্যই অপেক্ষা করে আছে,
এই পাখিদের খাবারের খোঁজে সাগরে যাওয়ার দরকার হয়না।
স্কুয়া পাখিরা শিকারি প্রাণীদের মধ্যে সবচে দক্ষিনে বসবাস করতে পারে
পেট্রেল পাখিদের পাথর খোঁজার দরকারকে কাজে লাগিয়ে
এমনকি সবচে বেশী গরমেও, এন্টার্কটিকার মাত্র তিন শতাংশ বরফমুক্ত হয়,
এবং প্রায় সব বরফমুক্ত পাথরগুলি একই স্থানে,
এই এন্টার্কটিকার উপদ্বীপে
মূল ভুমি থেকে এই লম্বা হাতের মতো বের হয়ে উত্তর দিকে সাগরে ঢুকে গেছে, তাই এখান বসন্ত আগে আসে
বরফ গলে এক সুরক্ষিত উপসাগর তৈরি হয়,
যেটা প্রাণীদের এই উত্তাল দক্ষিনসাগর থেকে মুক্তির পথ
গভীরে কিছু একটা তোলপাড় হচ্ছে, ..
কুঁজো তিমি,
তারা প্রায় ৫০০০ মাইল পাড়ি দিয়ে এখানে এসেছে,
এই তিমিগুলো ক্রিল শিকার করছে,
চিংড়ি মাছের মতো প্রাণী যেগুলো বরফ সরে যাওয়ার সাথে সাথে ঝাকে ঝাকে চলে আসে,
সাগরের গভীরে ডুব দিয়ে,
এই তিমির দল খুব কাছাকাছি থেকে ঘুরতে ঘুরতে
তাদের নাক দিয়ে বুদ বুদ ছাড়তে থাকে এবং তাদের শিকারের দিকে এগিয়ে যায়,
এই বুদবুদ গুলো থেকে বাঁচতে ক্রিলগুলো মাঝে এসে জড়ো হয়ে তিমির শিকারে পরিণত হয়,
এই দলটিকে সব সময় কাজ করতে হয়, কারন এই ঝাক বেশিক্ষণ থাকবে না।
গ্রীষ্ম আস্তে আস্তে মলিন হয়ে যাচ্ছে, এবং এই তিমিগুলো শীত আসার আগেই উত্তরে চলে যাবে,
সূর্যের তেজ আস্তে আস্তে কমতে থাকে এবং সাগরও জমে যেতে থাকে।
পৃথিবীর সবচে বড় ঋতুপরিবর্তন আসন্ন।
বরফ এখানে খুব দ্রুত জমে যায়, অবাক করে দিয়ে দিনে প্রায় দুই আড়াই মাইল পর্যন্ত
প্রায় এক সপ্তাহের মধ্যে এই মহাদেশ দ্বিগুণ হয়ে যাবে।
জীবন পালিয়ে যায় এন্টার্কটিকা থেকে।
কিন্তু একটি প্রাণী সবেমাত্র আসতে শুরু করেছে,
প্রতি শীতে, এম্পেরর পেঙ্গুইন তাদের সাগরের বাসা ছেড়ে এক অসাধারন যাত্রা শুরু করে
তারা উপকুল থেকে প্রায় একশ মাইল ভেতরে তাদের ডিম পাড়ার স্থানে ফিরে আসে।
প্রকৃতপক্ষে এই এম্পেরর পেঙ্গুইনেরা ফিরে আসে যেখানে তারা জন্মেছিল।
জমে যাওয়া বরফের সাগরের মাঝে চারপাশের বরফের বেষ্টনী দ্বারা নিরাপদ আশ্রয়,
এখানে তারা তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বড় করবে
কিন্তু প্রথমে তাদের সঙ্গী খুঁজে নিতে হবে,
পুরুষেরা তাদের প্রদর্শনী শুরু করে
এবং যদি মেয়েটির তাকে পছন্দ হয়, তাহলে তারা একত্র হয়, এবং মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে যায়,
নতুন জুটি খুব দ্রুতই শক্ত বন্ধনে আবদ্ধ হয়,
এবং তারা তাদের চারপাশের কোলাহলকে তেমন পাত্তাই দেয় না।
তাদের বন্ধন আরো মজবুত করতে, পুরুষটি তার সঙ্গীকে নিয়ে বেড়িয়ে আসে
তাদের ক্ষণিকের মিলন সম্পন্ন হয়, তাদের হাতে নস্ট করার সময় নেই।
ভালো করার অনেক চাপ থাকার কারনেই, সব পুরুষকেই উপরে থাকার জন্য কসরত করতে হয়।
কয়েক সপ্তাহ পরেই বোঝা যায়, বেশীরভাগ দম্পতিরাই সফল হয়েছে,
কিন্তু এই ডিম উৎপন্ন করতে মুল্য দিতে হয়েছে,
মেয়েটির এই ডিমে তা দেয়ার শক্তি অবশিষ্ট নেই।
তাই পুরুষেরা দায়িত্ব নেয়।
এখানে তাপমাত্রা এখন হিমাংকের ২০ ডিগ্রী নীচে, তাই জমে যাওয়া থেকে বাঁচতে ডিমটি দ্রুত হাতবদল করতে হবে।
বাসা বানানোর কোন পাথর না থাকায়, পুরুষটি ডিমটিকে তাদের একটি বিশেষ থলিতে রেখে দেয়,
যেখানে এটি গরম থাকবে,
এর জন্য দরকার এক অসাধারন দলগত প্রচেষ্টা।
ক্ষুধায় কাতর মেয়ে পেঙ্গুইনগুলো একাই সাগরে ফিরে যায়,
যে রাস্তায় তারা এক মাস আগে পুরুষগুলির সাথে এসেছিল সেই রাস্তা ধরেই তারা ফেরত যায়,
এখন সূর্যকে দিগন্ত রেখা থেকে খুব কমই উপরে দেখা যায়,
দিন যতই ছোট হতে থাকে এর উষ্ণতাও ধীরে ধীরে কমতে থাকে,
মেয়েরা চলে গেলে এই আবাসভুমিটিতে একটি অবিশ্বাস্য পরিবর্তন ঘটে
তাদের ডিমগুলিকে এখনো পায়ের উপর ধরে রেখে, তারা দলে দলে একত্রিত হয়,
তারা নিজেদের গরম রাখার জন্য একে অপরের সাথে জড়াজড়ি করে লেগে থাকে,
এই ঘটনাটিকে দ্রুতগতিতে দেখলে বোঝা যায় তারা কিভাবে নিজেরা স্থান পরিবর্তন করে।
এভাবে প্রতিটা পেঙ্গুইন পালাবদল করে ভিতরে গরমে থাকার সুযোগ পায়,
কাধে কাধ মিলিয়ে দলবদ্ধ হয়ে থাকা এই পাখিগুলো খুবই শান্ত স্বভাবের, না হয়ে উপায়ও নেই।
এই বন্ধন এক বারের জন্যও ছুটে গেলে, মুল্যবান তাপমাত্রা হারিয়ে যাবে,
তাই যত দ্রুত সম্ভব তারা আবার জড়ো হয়ে যায়,
তাই সকলে মিলে এক হয়ে কাজ করার মাধ্যমেই তারা এই কঠিন সময় পার করে দেয় এবং তাদের ডিমকে রক্ষা করতে পারে
কিন্তু তাদের আসল পরীক্ষা এখনো বাকি আছে,
যতই শীত বাড়তে থাকে, শৈত্য প্রবাহের কারনে তাপমাত্রা অনেক নীচে নেমে যায়,
এখন তাপমাত্রা হিমাংকের ৬০ ডিগ্রী নীচে
কিনারের দিকে থাকা পাখিগুলোকে
শত মাইল বেগে আসা বাতাসকে সহ্য করতে হয়।
এবং যারা মাঝে আছে তাদের রক্ষা করতে হয়,
সূর্য দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়ে এই পুরুষ পাখিগুলো তাদের ডিম সহ একাকী রয়ে গেছে
এই পৃথিবীর সবচে ঠান্ডা এবং অন্ধকার শীত পার করার জন্য।
আমাদের পৃথিবীর একেবারে উত্তরপ্রান্তে
কয়েক মাসের মধ্যে প্রথমবারের মতো সূর্যের আলো এক আলাদা বরফের পৃথিবীকে আলোকিত করছে,
এন্টার্কটিকার উল্টো, উত্তর মেরু চারদিকে স্থলভাগ দিয়ে বেস্টিত একটি জমে যাওয়া সাগর
এখানে শীত শেষ হয়ে আসছে।
কিন্তু এই কঠিন প্রকৃতি এখনো বরফে ঢাকা,
এইডার হাসের শব্দে নিরবতা ভাঙ্গে,
দক্ষিনে আরো গরমের দিকে না গিয়ে তারা উত্তরের এই শীত সহ্য করে এখানে থেকে গিয়েছিল,
চল্লিশ হাজারের বড় একটি ঝাক, বরফের আচ্ছাদনের উপর দিয়ে উড়ে যায়,
তাদের সবার গন্তব্য একটিই,
একটা পলিনিয়ার, তীব্র সাগরের স্রোতে তৈরি হওয়া বরফের মাঝে একটি ছোট গর্ত
এই অস্বাভাবিক ছোট পুকুরটি তাদের রাতের আবাস ছিল,
এবং দিনের আলোতে, খাওয়ার সুযোগ মেলে।
বরফের মাত্র দশ মিটার নীচে, সাগরের তলায় ঝিনুকের ঘন বসতি,
সাগরের স্রোত একটু কমে আসলেই কেবলমাত্র সেখানে পৌঁছা সম্ভব।
তাই হাসগুলোকে খুব দ্রুত ঝিনুকটিকে আলাদা করে ফেলতে হবে স্রোত ফিরে আসার আগেই।
এই সুযোগটা খুব অল্প সময়ের জন্য থাকে,
যতই স্রোত বাড়তে থাকে এটাও উপরে উঠতে থাকে
এই স্থায়ী গর্তটা এই হাঁসেদের সারা শীত জুড়ে খাবার যুগিয়ে আসে,
এই ভোজ অন্যদেরও আকৃষ্ট করে,
উত্তর মেরুতে, বরফের যে কোন ফাটল জীবনদায়ী রুপে দেখা দিতে পারে
চমরী গরুগুলো নিজেরাই গর্ত করে নেয়,
এই দৈত্যাকারের প্রাণীগুলোর বরফের চাই ভাঙ্গার মতো শক্তি আছে,
বরফের নীচের ঘাস খাওয়ার জন্য,
এই বরফ ভাঙ্গার মাধ্যমে তারা অন্য অধিবাসীদের জন্যও সুযোগ করে দেয়,
টারমিগানের দল এই চমরী গরুগুলোর সাথে এক অস্বাভাবিক বন্ধুত্ব গড়ে তোলে।
যাদের সাহচর্য চলে সারা দিন ধরেই
এই তৃণভোজীদের মিলনমেলা চোখ এড়ায় না।
একটি উত্তর মেরুর শেয়াল,
চমরী গাভীগুলো কিছুদিন আগেই বাচ্চা দিয়েছে,
শেয়ালগুলির জন্য এটা একটা সুযোগ
কিন্তু এই অর্ধটন ওজনের রাগী চমরী গরুগুলো লড়াইয়ের জন্য উপযুক্ত প্রতিপক্ষ নয়,
বাচ্চাগুলো বসন্তের বরফ গলার আগেই জন্মায়,
গ্রীষ্মের আগাম প্রস্তুতি নেয়ার জন্য।
এটাকে এখন এই বরফের পৃথিবীতে পা রাখা শিখতে হবে।
এক মিনিটের ঝলমলে দিনে পরের মিনিট তুষারঝড়,
এমনকি বসন্তের সময়ও শীত হাড়ে কাপুনি ধরায়।
বাচ্চাটিকে এই ঝড়ে হারিয়ে যাওয়া থেকে বাঁচতে মায়ের কাছাকাছি থাকতে হবে,
উত্তর মেরুর নেকড়ে বাঘ।
চারপাশের এই সাদার মাঝে, এদের খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।
কিন্তু এই চমরী গরুগুলো এটা আঁচ করতে পেরেই উপরে উঠে যায়,
বাচ্চাগুলিকে ঘিরে এক নিরাপদ বেষ্টনী তৈরি করে,
এই বড়দের নিরাপদ বেস্টনীতে আক্রমন করার সাহস খুব কম প্রাণীরাই রাখে,
আর এই নেকড়েটিরও আজকে মার খাওয়ার তেমন ইচ্ছে নেই,
তাড়াহুড়োর মধ্যে একটি বাচ্চা পিছনে পরে গেছে।
No comments yet. Be the first to leave one.