The first 154 lines.
বাংলা সাব সজীব
আমাদের পৃথিবীতে মহাদেশগুলোর প্রান্তসীমায় ঝালরের মতো ঝুলে আছে অগভীর সাগরগুলো।
মহাদেশের প্রান্তসীমার এই সাগরগুলো খুব কমই দুশো মিটারের চেয়ে বেশী গভীর এবং
মাঝে মাঝে শত শত মাইল পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে
যতক্ষণ না সাগর তলের গভীরতা হঠাত গভীর কালো সমুদ্রে নেমে যায়
সব মিলিয়ে আমাদের পৃথিবীর সমুদ্রের মাত্র আট শতাংশ এই অগভীর সাগরগুলো
কিন্তু তারা বেশিরভাগ জলজ প্রানীকে লালন করে।
একটি পুরুষ কুঁজো তিমি সঙ্গীকে আকৃষ্ট করার জন্য ডাকছে,
তিমিগুলো তাদের বাচ্চা দেয়ার স্থানে ফিরে এসেছে
ক্রান্তীয় অঞ্চলের এই অগভীর সাগরে।
বাচ্চাটির বয়স কয়েক সপ্তাহের বেশি না।
লম্বায় প্রায় তিন মিটার এবং ওজন এক টনের বেশি হওয়া সত্ত্বেও
এটা অনেক দুর্বল।
কিন্তু তার মা তার দেখাশুনা করছে।
এবং যখন সে দুর্বল হয়ে পরে মা তাকে উপরে উঠতে সাহায্য করে
যাতে সে সহজেই শ্বাস নিতে পারে।
বিষুব রেখার কাছে এই অগভীর সাগরগুলো বাচ্চা বড় করার এক উত্তম জায়গা।
এ জায়গাটি উষ্ণ, শান্ত এবং খুব কম শিকারি মাছ থাকে এখানে।
এই খেলায় মগ্ন বাচ্চাটি প্রতিদিন প্রায় পাঁচশো লিটার দুধ খায়,
কিন্তু তার মা না খেয়ে আছে,
তার জন্য এখানে খাওয়ার কিছুই নেই।
বেশিরভাগ ক্রান্তীয় অগভীর সাগরগুলোতে
এই কাচের মতো স্বচ্ছ পানি প্রায় প্রানহীন।
তারা সারা বছর সূর্যের আলো পেলেও
প্লাঙ্কটন জন্মানোর মতো দরকারি খাবার নেই এই পানিতে,
মা তিমিটিকে এই বাচ্চাকে নিয়ে আরো পাঁচ মাস এখানে থাকতে হবে,
যতক্ষণ না তার বাচ্চাটি মেরু অঞ্চলে তাদের খাওয়ার জায়গায় যাওয়ার মতো বড় হচ্ছে,
পানির মরুভুমিতে প্রবাল প্রাচীর গুলো মরূদ্যানের মতো।
বেশিরভাগ ক্রান্তীয় অগভীর সাগরগুলো নিস্ফলা
কিন্তু এই প্রবালের স্বর্গগুলিতে পৃথিবীর জলজীবনের চারভাগের একভাগ বসবাস করে,
এই প্রাচীরগুলি এক প্রবাল কীটের তৈরি
ছোট হাইড্রাসদৃশ এক ধরনের দলবদ্ধ প্রানী।
তারপরও এই গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ এতো বড় যে এটা চাঁদ থেকেও দেখা যায়,
এটা আসলে দুই হাজার আলাদা আলাদা প্রাচীর
একত্র হয়ে একটি বিশাল প্রাচীর তৈরি করেছে যা প্রায় এক হাজার মাইলের চেয়ে বেশি লম্বা
হয়ে অস্ট্রেলিয়ার উত্তর পূর্বাঞ্চলের তটরেখা বরাবর অবস্থান করছে,
এতো বিশাল হওয়া সত্ত্বেও
এই প্রবাল প্রাচীরে খুব বেশী প্রকারের জলজ প্রানী বসবাস করেনা।
এর জন্য আপনাকে আরো একটু উত্তরে যেতে হবে, ইন্দোনেশিয়ায়।
ইন্দোনেশিয়াতে এমনও একটি প্রবাল প্রাচীর আছে, যেখানে গোটা ক্যারিবিয় দ্বীপপুঞ্জের
চেয়ে বেশী প্রজাতির মাছ বাস করে।
এখানে প্রায় দশগুন বেশী প্রকারের প্রবাল দেখা যায়,
এই পানিতে ক্ষুদ্রাকৃতির জলজ উদ্ভিদ শৈবালের সাহায্যে প্রবালেরা বিকশিত হয়,
যেগুলো এই প্রবাল কীটগুলোর গায়ে জন্মায়।
এই কীটগুলো তাদের তন্তুর মতো আঁকশি দিয়ে স্রোতে ভেসে যাওয়া খাবার ধরে খায়,
রাতের বেলা শৈবালগুলি নিষ্ক্রিয় থাকে, কিন্তু তখন এই কীটগুলি আরো বেশি আঁকশি মেলে ধরে,
তাই, সত্যি বলতে এই প্রবাল সারাদিন খায়,
এবং কীটের সাথে শৈবালের এই বন্ধুত্ব উভয়ের জন্যই মঙ্গল বয়ে আনে,
এবং এরা উভয়েই, নিস্ফলা সাগরকে একটি পরিপুর্ন বাগানে পরিনত করে।
ইন্দোনেশিয়ার এই প্রবাল প্রাচীরগুলিতে নানা বিচিত্র প্রানের সমাহার
কারন এর অবস্থান এক বিশাল সংযোগস্থলে
এই স্থানটি দুটি বিশাল সমুদ্রের মিলনস্থল, ভারত মহাসাগর এবং প্রশান্ত মহাসাগর।
এখানে সব কিছুকেই কাছ থেকে দেখতে হবে।
এই প্রবাল প্রাচীরের গায়ে দুটি প্রবাল কিন্তু প্রবাল নয়।
তারা পৃথিবীর সবচে ছোট পিগমি সি হর্স দুই সেন্টিমিটারের চেয়ে কম লম্বা।
এদুটো পুরুষ, তারা তাদের এলাকার দখল সমস্যার সমাধান করছে, মাথা ঠোকাঠুকি করে
একটি বিদ্যুৎ ঝলক ?
না, এটা একটা ঝিনুকের প্রদর্শনী
সম্ভবত এই ঝিনুকের খোলকের মাংসল আবরনের ঝলকানি
মাছেদের ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দেয়ার জন্য না অন্য কোন দরকারে তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারবে না,
এখানে সাপের দেখাও পাওয়া যায়, অনেক গুলো।
এগুলো সাগরের কেউটে, এরা মাটিতে ডিম পাড়ে
কিন্তু এখানে এই সাগরের পানিতে শিকার খোঁজে
তারা সোজা সাঁতারে মাছ ধরার মতো গতিশীল না।
তাই তারা প্রবালের ফাঁকে এবং পাথরের ফাটলে লুকনো শিকারের সন্ধান করে।
তাদের কামড় প্রচন্ড বিষাক্ত এবং এটা তার শিকারকে অবশ করে দেয়,
এবং এই প্রবালের জঙ্গলে সাপেরা একাকী শিকার করে না,
হলুদ গোট মাছ এবং ট্রিভালিও একই শিকারের সন্ধানে থাকে
যখন একটি দল এই প্রবালে শিকারের সন্ধানে নামে তারা সাপেদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে,
তখন আরেকটি দলও তাদের সাথে যোগ দেয়,
কমপক্ষে ত্রিশটি সাপ এই দলে যোগ দিয়েছে,
বড় মাছগুলোর ভয়ে ছোট মাছেরা পাথরের নিচে লুকোয়, আর সেখানে সাপগুলো তাদের সন্ধান করে,
এবং সাপেদের হাত থেকে কেউ পালিয়ে যেতে চাইলে, তারা সোজা গিয়ে ঢুকে পরে ট্রিভালিদের মুখে।
পালানোর কোন পথ নেই,
এভাবে শিকারি মাছেরা যখন প্রবালে হানা দেয়, আরো সাপেরা তাদের সাথে যোগ দেয়,
এই সাপ এবং মাছেদের সহযোগিতা অবাক করার মতো
এই ঘটনা ইদানিং আমাদের নজরে এসেছে, কারন শুধুমাত্র ইন্দোনেশিয়ার এই দুর্গম প্রবাল প্রাচীরেই এরকম ঘটে
হয়তো এই যুগলবন্দী একসময় সাধারন একটা দৃশ্য ছিল,
কিন্তু এখন ইন্দোনেশিয়ার প্রবাল প্রাচীরগুলির মাত্র ছয় শতাংশের মতো ভালোভাবে টিকে আছে,
প্রবালপ্রাচীর পার হলে, শুরু হয় ক্রমাগত পরিবর্তনশীল বালির রাজত্ব।
এখানে লুকোনোর কোন জায়গা নেই, টিকে থাকা এখানে খুব কঠিন।
তাই ছদ্মবেশ এখানে খুব দরকারি।
যদি এটা না হেটে যেতো তাহলে এটাকে একটা শামুক বা পাথর বলে ভুল হতো। আসলে এটা অক্টোপাস
একটা গারনার্ড, এর পেটের পাখনা এর আকৃতিকে লুকিয়ে রাখে,
এবং এটা তাদেরকে বালি সরিয়ে খাবার খুঁজতেও সাহায্য করে,
বড় চোয়াল মাছেরা মাটির নিচে লুকোয়,
ছদ্মবেশি অক্টোপাসেরা এক দিক দিয়ে বেশ শক্তিশালী
এদের আছে এক ধরনের সতর্কতামুলক ছদ্মবেশ যেন সবাইকে বলছে, আমার পথ ছেড়ে দাড়াও।
এখানে সেখানে কিছু ঘাস গজিয়ে ওঠে,
এবং সবুজ কচ্ছপেরা সেগুলো খেয়ে নেয়,
সাগরতলের ঘাসেরা একমাত্র সামুদ্রিক উদ্ভিদ যাদের ফুল হয়,
যদিও অল্প কিছু ফিতার মতো পাতা দেখা যায়,
কিন্তু বালির নিচে তাদের পরিপুষ্ট শেকড় এবং
রাইজোমের জাল অনেকদূর বিস্তৃত
পরিপুষ্ট অবস্থায় তারা সাগরের তলদেশকে
পরিনত করতে পারে সাগরতলের তৃণভূমিতে
অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিম উপকূলের হাঙ্গর উপসাগরে সবচে বড় তৃণভূমি দেখা যায়
এই জলের নিচের তৃণভূমিটি পনের হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে আছে
এবং মাটির সমভুমির মতো, এখানেও তৃণভোজীরা হানা দেয়।
ডুগং,
ডুগং রা সাগরতলার সবচে বড় তৃণভোজী
তারা তিন মিটার লম্বা এবং ওজনে অর্ধেক টন পর্যন্ত হতে পারে
এবং তারা এই সাগরতলের ঘাসের শেকড় ছাড়া আর কিছুই খায় না,
তারা তাদের বাড়তি ঠোট দিয়ে বালির নিচ থেকে শেকড় তুলে আনে
একটি ঝাক এক দিনে একটি ফুটবল মাঠের
সমান এলাকার ঘাস খেয়ে ফেলতে পারে,
ক্রান্তীয় অঞ্চলের অগভীর সাগরগুলোতে খাবার সর্বত্র সমানভাবে পাওয়া যায় না,
এবং মাঝে মাঝে অনেক খুঁজে তারপর পাওয়া যায়,
কিন্তু বোতল মুখ ডলফিনগুলো অনেক কৌতূহলী খুব উদ্যমী এবং বেশ বুদ্ধিমান
এবং তারা খুঁজে পেয়েছে একটি বেইট মাছের ঝাক
তারা দল বেধে একটা ঢেউয়ের উপর উঠে একেবারে কিনারে চলে যায়,
এবং সেখানে মাছ ধরা খুব সহজ হয়,
পশ্চিম অস্ট্রেলিয়াতে,
এই ডলফিনগুলো আরো একটা কঠিন কাজ হাতে নিয়েছে,
মাছটি সাগর পারে আস্রয় নিয়েছে,
যেখানে পানি মাত্র কয়েক সেন্টিমিটার
অনেক সময় ডলফিন গুলো লেজের ঝাপটায় মাছটিকে অজ্ঞান করে দেয়,
কিন্তু এখানে এই পদ্ধতি কাজ করছে না,
মাছটি খুব কাছে,
কিন্তু এখনো নাগালের বাইরে, তাই ডলফিনটি অন্য কৌশল নেয়,
দ্রুত লেজের ঝাপটায় সে কিছুটা গতি বাড়িয়ে নেয়,
এবং তারপর বিমানের মতো ধেয়ে আসে,
এই গতি তাকে পানির একদম কিনারে নিয়ে আসে একেবারে মাছটির কাছে,
তার মাটিতে আটকে পরার সম্ভাবনা তৈরি হয়,
কিন্তু ভাগ্য সাহসীদের সহায় হয়।
পাশেই, তরুন ডলফিনেরা দেখছে,
কিন্তু এ পর্যন্ত মাত্র আটটা ডলফিন
এই কৌশল আয়ত্ত করতে পেরেছে।
যদিও ক্রান্তীয় অঞ্চলের সাগরগুলোতে বেশির ভাগ প্রানী দেখা যায় প্রবাল প্রাচীরে
এবং সাগরতলের তৃণভূমিতে,
এদের কিছু অসাধারন ব্যাতিক্রম আছে।
বাহরাইনের এই মরুভুমিটি একটি অদ্ভুত জায়গা
এখানে সামুদ্রিক পাখির দেখা পাওয়ার কথা না,
কিন্তু প্রতি বছর প্রায় কয়েক লক্ষ হাড়গিলা পাখি এখানে ডিম পাড়তে আসে,
এখন প্রচন্ড গরম
তাই এভাবে জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে তারা গরমে অজ্ঞান হওয়া থেকে বাঁচে
এই জায়গাকে বাচ্চা বড় করার জন্য মোটেও ভাল জায়গা বলে মনে হয় না,
কিন্তু, এখানে অন্তত কোন শিকারি প্রাণী নেই,
ঝামেলার একমাত্র কারন হচ্ছে প্রতিবেশীরা
তাই প্রতিটি পাখিই ঠোকর মারা দূরত্ব পরিমান ফাঁকা রেখে বাসা তৈরি করে,
কিন্তু খাবারের কি হবে,
এখানে শুধু মাত্র বালি এবং তারপর তপ্ত সমুদ্র
কোনটাই এই এতোগুলো পাখির বাচ্চাকে বড় করার মতো খাবারের জোগান দিতে পারবে না,
এর উত্তর, বাতাসে ভেসে আসে,
মরুভুমির ধুলিঝরে বালু বাতাসে উড়ে যায়,
বাতাসে ভেসে তারা আরব সাগরে পরে
এই বালুগুলিই দরকারি খনিজ নিয়ে আসে,
এবং এদের কারনেই এই অগভীর সাগর, মাছের রাজত্বে পরিনত হয়,
তাই অদ্ভুতভাবে এই মরুভুমির বালুই এই আরব সাগরকে
আরেক মরুভুমি হওয়া থেকে রক্ষা করে,
তিমির বাচ্চাটি এখন পাঁচ মাস বয়স।
সে আকারে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে,
এবং এই ক্রান্তীয় সাগরের বাগানে তার খেলা করার দিন শেষ,
এটা ছিল বেড়ে ওঠার জন্য বেশ উষ্ণ এবং নিরাপদ এলাকা,
No comments yet. Be the first to leave one.